অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ

হ্যালো কৃষক ও বাগানি বন্ধুরা, আপনি কি ভাবছেন যে অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে কত টাকা আয় করতে পারবেন?

ঠিক আছে, আজকের লিখায় আমি অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষের আয়, চাষের খরচ এবং প্রতি একরে ফলন সম্পর্কে কিছু তথ্য দিবো।

অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ হল সবজি চাষ করার জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। যেখানে জৈব পদার্থ যেমন পশুর বর্জ্য, গাছের বর্জ্য, ফসলের বর্জ্য, খামারের বর্জ্য এবং জৈবিক উপকরণ ব্যবহার করে সবজির চাষ করা হয়। এই পদ্ধতিতে মাটিকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।

এই জৈব পদার্থগুলি জৈবসারে রূপান্তরিত হয়। যা ফসলে পুষ্টি প্রদান করে। এই পদ্ধতিতে কোন রকম দূষণ ছাড়াই পরিবেশ বান্ধব পরিবেশে সবজি চাষ করা সম্ভব।

অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, হরমোন, ফিড ইত্যাদির মতো উপাদান ব্যবহার করা হয়না বললেই চলে। তাই এটি পদ্ধতি মাটির পুষ্টি  ধরে রাখতে সাহায্য করে।

আলোচ্য বিষয় দেখুন

অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে আয়ের গাইড, এবং প্রজেক্ট রিপোর্ট

অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ

অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ মানুষের জন্য অত্যন্ত উপকারী। কারণ এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত শাকসবজির পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টিগুণ থাকে।

এই চাষ পদ্ধতি অণুজীব, মাটির ছোটো ছোটো উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগত ব্যবহার করে জৈবিক চক্রকে সচল রাখে। এটি দীর্ঘ সময়ের জন্য মাটির উর্বরতা ধরে রাখতে সাহায্য করে৷

অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ কিছুটা চ্যালেঞ্জিং কারণ এটি নতুনদের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি৷

যেমন মাটির প্রয়োজন এবং ব্যবস্থাপনা

সার, সালফার, পটাসিয়াম, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, কম্পোস্ট, জৈবসার, বোরন, সবুজ সার ইত্যাদি অর্গানিক সবজির জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বেশিরভাগ বাগানী কম্পোস্টের উপর নির্ভর করে। যা একটি প্রাকৃতিক সার হিসাবে বহুল পরিচিত।

সবুজ সার বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন পেতে সাহায্য করে, মাটির পুষ্টি বৃদ্ধি করে এবং জৈব পদার্থ, পুষ্টি সঞ্চয় ও ধরে রাখতে সাহায্য করে।

এটি মাটি দীর্ঘ সময়ের জন্য উর্বর রাখতে সাহায্য করে। এটি রোগ এবং পোকামাকড় প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

গোবর সার ও মাটির পুষ্টি উপাদান ধরে রাখতে সাহায্য করে। পটাশ সার মাটিতে পটাশিয়ামের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে।

মাটি ব্যবস্থাপনা কৌশল

অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামগুলি প্রাকৃতিক হওয়া উচিত। কারণ এই প্রক্রিয়া অণুজীব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

এই পদ্ধতিতে মাটি ব্যবস্থাপনার কৌশল একটু ভিন্ন। কারণ এই ধরনের চাষে কোনো রাসায়নিক পদার্থের প্রয়োজন হয় না।

জমি তৈরির পদ্ধতি

উপকরণ রোপণের মাটি ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট নিখুঁত ভাবে পরীক্ষা করা দরকার। কারণ সবজি আলগা, উর্বর মাটিতে ভালভাবে বৃদ্ধি পায়।

মাটি আলগা, উর্বর করার জন্য, জৈব সারের সাথে মাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মিশ্রিত করে নিতে হবে। উঁচু জমি অর্গানিক সবজি চাষে বেশি ফলদায়ক।

জমি তৈরির পদ্ধতি

মাটি ৮-১০ ইঞ্চি খনন করে, খনন করা অংশ ও তার উপরের ৪-৬ ইঞ্চি উঁচু করে আলগা, উর্বর মাটি দিয়ে ভরাট করে জমি  তৈরি করতে হবে।

এটি সবজির শিকড়কে ১২-১৬ ইঞ্চি গভীর পর্যন্ত বাড়তে সাহায্য করে। তবে জমি উঁচু করার পরিমাণ সবজিভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।

আরো পড়ুন- টবে পুদিনা পাতার চাষ পদ্ধতি

আবহাওয়ার  উপর ভিত্তি করে সবজির জাত নির্বাচন করা

আপনি যখন অর্গানিক সবজি চাষ বেছে নেবেন, তখন মাটি সমৃদ্ধভাবে তৈরি করা হবে যাতে আপনি যে কোন ঋতুতে যে কোনও ফসল ফলাতে পারেন।

তবে জলবায়ু পরিস্থিতির কারণে সবজি উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হতে পারে। তাই মৌসুমি সবজি বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের পরিচয়।

প্রয়োজনে স্থানীয় সরকারী কৃষি অফিসের পরামর্শ নিন। তারা আপনাকে উপযুক্ত সবজির জাত নির্বাচন করতে সাহায্য করবে।

অর্গানিক সবজি চাষ একটি লাভজনক কৃষি পদ্ধতি যেখানে আপনি যে কোন সবজি চাষ করতে পারেন। তারপরও এখানে কিছু সবজির নাম উল্লেখ করছি, যেগুলা চাষ করে বেশি লাভ করা সম্ভব-

  • বাঁধাকপি
  • ফুলকপি
  • ব্রকলি
  • মটর
  • মটরশুটি
  • পালং শাক
  • ভেষজ
  • লেটুস
  • ভুট্টা
  • টমেটো
  • চেরি টমেটো
  • ওকড়া
  • বেগুন
  • কুমড়ো
  • শসা
  • তরমুজ
  • গাজর
  • মূল
  • বিটরুট
  • আলু
  • পেঁয়াজ

অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষের গুরুত্ব 

সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রচলিত চাষাবাদের সময় ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক গুলো গবাদি পশুর অনেক রোগ-বালাই সৃষ্টি করে।

যার ফলে, অর্গানিক চাষ পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে। এই পদ্ধতিতে চাষ করা সবজি অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় ৫০% বেশি ভিটামিন এবং পুষ্টি সমৃদ্ধ।

অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষের গুরুত্ব

এটি মূলত পরিবেশকে নিরাপদ রাখে এবং মাটির ক্ষয় এড়িয়ে মাটির উর্বরতা বজায় রাখে। তাই, বাজারে এর উচ্চ চাহিদা রয়েছে এবং কৃষকরা এটিকে প্রচলিত চাষ পদ্ধতির তুলনায় সেরা চাষ পদ্ধতি হিসাবে বেছে নেয়।

অর্গানিক পদ্ধতিতে উদ্ভিদ প্ল্যান্টিং পদ্ধতি

অর্গানিক বীজ বা চারা বাজারে পাওয়া যায়। বপনের সময় প্রতিটি সবজি চাষের নিজস্ব নির্দেশাবলীগুলো মানা উচিত। অর্গানিক সবজি চাষে দুই ধরনের রোপণ পদ্ধতি রয়েছে-

  1. অর্গানিক বীজ রোপণ পদ্ধতিঃ অর্গানিক বীজগুলি তুলনামূলক সস্তা। প্রায় সব ধরণের জাতেরই বীজ পাওয়া যায়। আপনাকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেগুলি বড় করে তারপর রোপণ করতে হবে৷ কিছু সবজি যেমন গাজর, পালং শাক, মটর ইত্যাদি সরাসরি জমিতে বপন করা যায়। চারা রোপণের সময় এলে উঁচু জমিতে এদের রোপণ করতে হয়।
  2. অর্গানিক চারা রোপণ পদ্ধতি- আপনি যদি নতুন হয়ে থাকেন তাহলে এই পদ্ধতিটি আপনার জন্য নয়। এই পদ্ধতিতে চারা সংগ্রহ করার সময় একটু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং সংগৃহীত চারাগুলি সরাসরি জমিতে রোপণ করতে হবে। নার্সারি থেকে এই চারাগুলো সংগ্রহ করতে হবে।

কীভাবে অর্গানিক পদ্ধতিতে আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা যায়

আগাছা এই পদ্ধতিতে সবজি চাষে সবচেয়ে বেশি সমস্যা সৃষ্টি করে। কারণ এগুলি জৈব সার মেশানো মাটি থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং রোগ ও পোকামাকড়ের আশ্রয় সৃষ্টি করে।

সবজি চাষে সফলতার জন্য দ্রুত আগাছা নিধন করা উচিত। অর্গানিক ভাবে আগাছা নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া হল সবচেয়ে সাধারণ পদ্ধতি।

অর্গানিক ভাবে আগাছা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি যেমন-নাইট্রোজেন নিয়ন্ত্রণ এবং সেচ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করে আগাছার আর্দ্রতা হ্রাস করে আগাছার বৃদ্ধি কমানো যায়।

অর্গানিক পদ্ধতিতে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ

অর্গানিক ভাবে সবজি চাষে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের সর্বোত্তম উপায়গুলি হলো-

  • পরিমাণে বেশি কম্পোস্ট সার ব্যবহার করে মাটি তৈরি করা,
  • রোগ প্রতিরোধী সবজির বীজ বা উদ্ভিদ ব্যবহার কর,
  • সবজির বৃদ্ধির সময়ে সতর্কতা অবলম্বন করা,
  • গাছের ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল জায়গা ছেঁটে ফেলা,
  • পাতা শুষ্ক রাখা,
  • শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত সেচ,
  • সরাসরি সূর্যের আলো থেকে গাছকে রক্ষা করা,
  • পোকামাকড়ের আবাসস্থল নষ্ট করে ফেলা, ইত্যাদি।

অর্গানিক ভাবে সবজি চাষে জড়িত ঝুঁকি

এই পদ্ধতিতে সবজি চাষে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন-উচ্চ উৎপাদন খরচ, ছোটো খামারের ফলনের জন্য ও উচ্চ শ্রম মূল্য।

কিছু কৃষকের ক্ষেত্রে, তারা ফলনে সামান্য পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে। বিপণন খরচ তুলনামূলক বেশি। অর্গানিক জাতের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পরিকাঠামোর অভাব।

তবে আশার কথা হচ্ছে বর্তমানে সরবরাহের চেয়ে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ হওয়া সবজির চাহিদা অনেক বেশি।

অর্গানিক ভাবে চাষ হওয়া সবজি সংগ্রহের পদ্ধতি

বিভিন্ন জাতের সবজির জন্য বিভিন্ন উপায়ে অর্গানিক ভাবে চাষ হওয়া সবজি সংগ্রহ করা যেতে পারে।

অর্গানিক ভাবে চাষ হওয়া সবজি সংগ্রহের পদ্ধতি

কিছু জাতের সবজির ফলন বেশি আবার কিছু জাতের সবজির ফলন তুলনামূলক কম। প্রচলিত চাষের তুলনায় অর্গানিক ভাবে সবজি চাষে ফলনের কমপক্ষে ২৫% বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।

অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষে খরচ, আয় ও লাভ

একর প্রতি খরচ, আয় ও লাভের হিসাব নিচে উল্লেখ করা হলো। বিঃদ্রঃ ১ একর= ৩ বিঘা।

প্রতি একর জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষে খরচ

জমি তৈরি = ৩৪,০০০ টাকা

রোপণের উপকরণ = ২২,৫০০ টাকা

সার এবং জৈব সার = ৪৫,০০০ টাকা

উদ্ভিদ রক্ষণাবেক্ষণ = ৫,৫০০ টাকা

সেচ = ৩,৫০০ টাকা

শ্রমিক খরচ =৫৫,০০০ টাকা

অন্যান্য খরচ = ৩,৫০০ টাকা

মোট খরচ (আনুমানিক) = ১৬৯,০০০ টাকা।

প্রতি একর জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষে আয়

প্রতি ১ কেজি সবজির দাম উদাহরণস্বরূপ টমেটোর দাম – ২০ টাকা প্রতি কেজি। প্রতি একরে ফলন হবে ২০ টন। তাই প্রতি ১ একর থেকে টমেটোর আয় = ২০×২০,০০০= ৪০০,০০০ টাকা।(আনুমানিক, বাজার অনুসারে কম বেশি হতে পারে।)

প্রতি একর জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষে লাভ

লাভ = আয়- মোট খরচ = ৪০০,০০০ টাকা – ১৬৯,০০০ টাকা = ২৩১,০০০ টাকা।

তাই অর্গানিক ভাবে টমেটো চাষে একর প্রতি ২৩১,০০০ টাকা লাভ হয়। এই লাভের পরিমাণ সবজিভেদে, এলাকা ভেদে এবং বাজার ভেদে আলাদা আলাদা হবে।

শেষ কথা

অর্গানিক পদ্ধতিতে সবজি চাষে নানা ঝুকির পাশাপাশি অনেক সম্ভবনাও রয়েছে। আর যেহেতু লাভ এলাকাভেদে ও বাজারভেদে আলাদা হবে তাই আপনার এলাকার সার্বিক অবস্থা বুঝে, হিসাব করে সিদ্ধান্ত নিন আপনি এই পদ্ধতিতে আগাবেন কিনা। আর আমাদের লিখা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য জানাতে ভুলবেন না।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.